Pakistan–Bangladesh JF-17 Fighter Jet Deal:পাকিস্তানের থেকে কী ধরনের যুদ্ধবিমান কিনতে চলেছে বাংলাদেশ? বদলাচ্ছে কি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণ
দিল্লি | ০৮ জানুয়ারি ২০২৬
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক যখন একাধিক ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক ও সামরিক মানচিত্রে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে JF-17 Thunder যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দুই দেশের বিমানবাহিনী প্রধানদের মধ্যে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম।
এই সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধুমাত্র একটি অস্ত্র কেনাবেচার বিষয় নয়—বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে শীতলতা, পাকিস্তানের সঙ্গে উষ্ণতা
গত কয়েক বছরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একাধিক জটিলতা সামনে এসেছে। সীমান্ত সমস্যা, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিতর্ক, জল বণ্টন এবং ভিসা নীতির মতো বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। এই আবহেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিকল্প কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারদের দিকে নজর বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অতীতের রাজনৈতিক ক্ষত ও মতপার্থক্যের কারণে স্থবির ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কূটনৈতিক স্তরে যোগাযোগ বৃদ্ধি, সামরিক সহযোগিতা এবং সরাসরি বিমান পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়া—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে।
JF-17 যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে আলোচনা: কী জানা যাচ্ছে
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি স্টার’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সূত্র নিশ্চিত করেছে যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনী প্রধানরা একাধিক সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাংলাদেশকে JF-17 Thunder যুদ্ধবিমান বিক্রি।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রেস উইং-এর বরাতে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রধান জহির আহমেদ বাবর সিধু এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান হাসান মাহমুদ খান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সহযোগিতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
১০ বছর পর ঢাকা–করাচি সরাসরি বিমান পরিষেবা
এই প্রতিরক্ষা আলোচনার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হল ঢাকা–করাচি সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হওয়া। প্রায় এক দশক পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিমান সংস্থা বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে এই রুটে ফ্লাইট চালু করতে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি বিমান পরিষেবা শুধু বাণিজ্য বা পর্যটনের জন্য নয়, বরং সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে: পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিবৃতি
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর তরফে জারি করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে—
“এই বৈঠকে কার্যকর সহযোগিতা জোরদার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহাকাশ খাতে সহযোগিতার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।”
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রশংসা করেন। তিনি পুরনো বিমানগুলির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, এয়ার ডিফেন্স রাডার সিস্টেম এবং আকাশ নজরদারি ক্ষমতা উন্নত করার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা চেয়েছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পরিদর্শন
এই সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পরিদর্শন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
-
ন্যাশনাল ISR ও ইন্টিগ্রেটেড এয়ার অপারেশন্স সেন্টার
-
পাকিস্তান এয়ার ফোর্স সাইবার কমান্ড
-
ন্যাশনাল অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পার্ক
এই পরিদর্শন ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতার সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করেছে।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও পাকিস্তানি হাইকমিশনারের বৈঠক
গত ২৮ ডিসেম্বর, ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার। এই বৈঠকেই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এর আগেও পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির প্রধান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন।
JF-17 Thunder: কী ধরনের যুদ্ধবিমান এটি
JF-17 Thunder একটি হালকা, একক ইঞ্জিন বিশিষ্ট, বহুমুখী যুদ্ধবিমান। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছে—
-
পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (PAC)
-
চিনের চেংডু এয়ারক্রাফ্ট কর্পোরেশন (CAC)
এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা যায়—
-
আকাশে নজরদারি
-
শত্রু বিমান আটকানো
-
স্থল আক্রমণ
-
সীমান্ত প্রতিরক্ষা
কম খরচে রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক অ্যাভিওনিক্স ব্যবস্থার জন্য এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়।
বাংলাদেশ কেন আগ্রহী JF-17 নিয়ে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর একটি বড় অংশ এখনও তুলনামূলক পুরনো প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভরশীল। আধুনিকায়নের জন্য—
-
কম খরচ
-
দ্রুত সরবরাহ
-
প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা
এই তিনটি বিষয় JF-17 কে বাংলাদেশের কাছে বাস্তবসম্মত বিকল্প করে তুলেছে।
এই চুক্তি ভারতের উপর কী প্রভাব ফেলবে?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্ভাব্য চুক্তি ভারতের সামরিক শক্তির উপর কোনও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে না। ভারতের কাছে ইতিমধ্যেই রয়েছে—
-
রাফাল
-
সুখোই-৩০ এমকেআই
-
তেজাসের মতো আধুনিক যুদ্ধবিমান
ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত অবস্থান পাকিস্তান ও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার বদলানো সমীকরণ
তবে এই ঘটনা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পুরনো রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে পাশে রেখে নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার পথে হাঁটছে। বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের এই উন্নতি সেই পরিবর্তনেরই প্রতিফলন।
উপসংহার
JF-17 যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা শুধুমাত্র একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। ভবিষ্যতে এই আলোচনা কোন দিকে এগোয়, সেদিকেই এখন নজর গোটা অঞ্চলের।


0 মন্তব্যসমূহ
welcome to India tonight news