📅 প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০২৫
📍 দিল্লি-ঢাকা সংযোগ রিপোর্ট
পরিচয় ও প্রেক্ষাপট
২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কঠোরভাবে দমন করা হয়। কিন্তু নতুন করে উঠে আসা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) নামক কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন এখন বাংলাদেশে নিজের ভিত্তি গড়ে তুলতে চাইছে।
পাকিস্তানের সীমান্তে দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত সংঘর্ষে জড়িত থাকা এই সংগঠনটি এখন বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে এবং এখানকার তরুণদের নিজেদের নেটওয়ার্কে টানতে শুরু করেছে।
টিটিপি কী? – একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান মূলত পাকিস্তানি তালিবানদের ছত্রছায়ায় গঠিত একটি চরমপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী। তাদের প্রধান লক্ষ্য পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে 'ইসলামিক শরিয়া' প্রতিষ্ঠা করা। আফগানিস্তানের তালিবানদের সঙ্গেও তাদের আদর্শগত সংযোগ রয়েছে, যদিও কিছু ক্ষেত্রের মতানৈক্য লক্ষ করা যায়।
কেন বাংলাদেশ? টার্গেটে তরুণ মগজ
গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্ব, ধর্মীয় আবেগ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা টিটিপির মতো সংগঠনগুলোর জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে তরুণদের টার্গেট করা হচ্ছে।
ঢাকার অজ্ঞতা – বড় বিপদের ইঙ্গিত?
এই গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রশাসন বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া খুবই সীমিত। সরকারি স্তরে দাবি করা হচ্ছে দেশে “জঙ্গিবাদ প্রায় নির্মূল”, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশি তরুণের আফগানিস্তানে যাত্রা – প্রমাণ পাওয়া গেছে
ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একাধিক বাংলাদেশি যুবক টিটিপিতে যোগ দিয়েছেন। একজন আফগানিস্তানে গিয়ে পাকিস্তানি সেনার গুলিতে নিহত হয়েছেন। অন্যজন বর্তমানে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।
শামিন মাহফুজ – এক বিপজ্জনক সংযোগসূত্র
গ্রেপ্তার হওয়া শামিন মাহফুজ ছিলেন এক সময় জেএমবির নেতা। পরে তিনি জামা’আতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া নামে একটি নতুন সংগঠন গড়েন। তার মাধ্যমে টিটিপি ও বাংলাদেশের স্থানীয় জেহাদি সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় গড়ে ওঠে বলে সন্দেহ।
সাভারের ফয়সাল ও পাকিস্তানি সংযোগ
আরও এক বিস্ময়কর তথ্য, মো. ফয়সাল নামে এক বাংলাদেশি যুবক স্বীকার করেছেন, ইমরান হায়দার নামে পাকিস্তানি একজন বিমান প্রকৌশলীর মাধ্যমে তাকে আফগানিস্তানে পাঠানো হয়। তার মতে, এই নেটওয়ার্কে আরও ৮-১০ জন বাংলাদেশি যুক্ত।
মালয়েশিয়া থেকে ধরা পড়ল বাংলাদেশি টিটিপি মডিউল
জুন ২০২৫-এ মালয়েশিয়ায় ৩৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা চরমপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। এদের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যকলাপের সরাসরি প্রমাণ রয়েছে। মালয়েশিয়া এখন বাংলাদেশের ‘রিক্রুটমেন্ট ও প্রোপাগান্ডা’ হাব হিসেবে পরিণত হচ্ছে বলে দাবি গোয়েন্দা সূত্রের।
ভারতে উদ্বেগ – সীমান্তপথে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা
ভারত-বাংলাদেশ ৪,০৯৬ কিমি দীর্ঘ সীমান্তের কারণে, এই সংকট ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছেও চিন্তার। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত সীমান্ত ঘেঁষা রাজ্যগুলিতে টিটিপি-প্রভাবিত অনুপ্রবেশকারী ঢুকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে ব্রেনওয়াশ
অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণরাও মাঝে মাঝে ধর্মীয় বিভ্রান্তি ও জাতীয়তাবাদী ভুল ব্যাখ্যার শিকার হয়ে জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকছে। “আনসার উল হক” নামের এক টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে প্রায় ২০০০ জন বাংলাদেশির চ্যাটলগ উদ্ধার করেছে নিরাপত্তা সংস্থা।
হোলি আর্টিজানের পরে কী শিখলো বাংলাদেশ?
২০১৬ সালের পর দেশজুড়ে কড়া নজরদারি ও অভিযানের পর মনে করা হয়েছিল জঙ্গিবাদ নিঃশেষ। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে আবার টিটিপির পুনরাবির্ভাব এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। অনেকেই মনে করছেন, নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সরকার কী করছে? বিরোধীদের অভিযোগ
সরকার বলছে দেশে কোনও জঙ্গি তৎপরতা নেই। কিন্তু বিরোধীরা অভিযোগ করছে, প্রশাসন কেবল নির্বাচন আর রাজনৈতিক বিরোধিতায় ব্যস্ত। জঙ্গিদের আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ে সরকারের আগ্রহ বা সক্ষমতা নেই।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশে ইসলামিক চরমপন্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত পেয়ে উদ্বিগ্ন। ২০২৫ সালের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক প্রতিবেদনে টিটিপি-বাংলাদেশ যোগ নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উচিত—
-
অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নজরদারি বাড়ানো
-
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময় জোরদার
-
সীমান্ত এলাকায় নজরদারি শক্ত করা
-
তরুণদের জন্য কাউন্টার-র্যাডিক্যালাইজেশন প্রোগ্রাম শুরু করা
উপসংহার – সময়ের আগে প্রস্তুতি না নিলে দেরি হয়ে যাবে
টিটিপি বাংলাদেশে সক্রিয় হলে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। প্রশাসন, মিডিয়া ও সাধারণ মানুষ—সবাইকে সতর্ক হতে হবে।
একবার যদি এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা নিভিয়ে ফেলা সহজ হবে না।


0 মন্তব্যসমূহ
welcome to India tonight news