এক ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
ভারতের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে ১৫ জুলাই ২০২৫ এক স্মরণীয় দিন। আজকের দিনে ভারতের সাহসী সন্তান, লখনউয়ের বাসিন্দা গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) থেকে সফলভাবে ফিরে এলেন পৃথিবীতে। এই ঘটনা শুধু বিজ্ঞানপ্রেমীদের নয়, সমস্ত ভারতীয় নাগরিকদের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার ঘটিয়েছে।
কে এই শুভাংশু শুক্লা?
উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউয়ে জন্ম নেওয়া শুভাংশু শুক্লা ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। বিমান সেনায় পাইলট হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি ধাপে ধাপে দেশের জন্য কাজ করেছেন। পরবর্তীতে ইসরোর মানব মহাকাশ প্রকল্পে নির্বাচিত হয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করেন। এরপরই তিনি নির্বাচিত হন Axiom-4 মিশনে যাওয়ার জন্য।
শুভাংশুর মহাকাশ যাত্রা: সূচনার দিন
২০২৫ সালের ২৫ জুন, শুভাংশু শুক্লা ও তাঁর তিন সহযাত্রী ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন। মহাকাশযান ড্রাগন তাদের পৌঁছে দেয় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে। ২৬ জুন, তারা সফলভাবে ISS-এর সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর শুরু হয় ১৮ দিনের বৈজ্ঞানিক অভিযান।
Axiom-4 মিশনের পটভূমি
এই মিশন পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা Axiom Space। এটি ছিল তাদের চতুর্থ মানব মহাকাশ মিশন। এই মিশনে ভারত, পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি-সহ আন্তর্জাতিক দল অংশ নেয়। মিশনের প্রধান ছিলেন নাসার প্রাক্তন মহাকাশচারী পেগি হুইটসন।
স্পেসএক্স ড্রাগন ক্যাপসুলের অবতরণ
১৫ জুলাই, ভারতীয় সময় দুপুর ৩:০১ মিনিটে, ড্রাগন ক্যাপসুল প্রশান্ত মহাসাগরে সফলভাবে অবতরণ করে। ৪টি প্যারাসুট দিয়ে ধীরে ধীরে এটি সমুদ্রে নামে। রিকভারি জাহাজ থেকে ক্যাপসুলটি জল থেকে তুলে আনা হয় এবং প্রত্যেক মহাকাশচারীকে বিশেষ সুরক্ষায় বাইরে নিয়ে আসা হয়।
ক্যাপসুল থেকে রিকভারি পর্যন্ত
মহাকাশযাত্রা শেষে শরীর ও মনে ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেক মহাকাশচারী সুস্থ ছিলেন। তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পেগি হুইটসন ও শুভাংশু শুক্লা। এই অবতরণ ছিল নিখুঁত ও নিরাপদ, যা আবারো স্পেসএক্স-এর প্রযুক্তির দক্ষতা প্রমাণ করল।
লখনউতে শুক্লা পরিবারে আবেগের বন্যা
লখনউর শুক্লা পরিবার এক অনন্য দিন পার করল। শম্ভু দয়াল শুক্লা ও আশা শুক্লা সংবাদ মাধ্যমে তাঁদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। চোখের জলে ডুবে গিয়ে বলেন—
“অনেক বড় মিশন করে এসেছে আমাদের ছেলে। আজ গোটা দেশ ওর জন্য গর্বিত।”
আশা শুক্লার চোখে ‘আমার ছেলে...’
শুধু একজন মা নন, আশা শুক্লা যেন প্রতিটি ভারতীয় মায়ের প্রতিচ্ছবি। তাঁর কথায়—
“ও আমার ছেলে, কিন্তু আজ ওর মধ্যে আমি দেশের প্রত্যেক মায়ের সন্তানের মুখ দেখছি। সে শুধু আমার ছেলে নয়, সে এখন ভারতের ছেলে।”
আইএসএস-এ বৈজ্ঞানিক কাজ ও সফলতা
শুভাংশু শুক্লা ১৮ দিনে অংশ নেন ৬০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল:
-
মহাকাশে শাকসবজি ও ফসল উৎপাদনের পরীক্ষা
-
মানবদেহে মহাকাশ পরিবেশের প্রভাব
-
মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে জীবাণুর আচরণ
-
ন্যানোটেকনোলজি বিষয়ক গবেষণা
এইসব পরীক্ষা ভবিষ্যতের চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শুভাংশুর সহযাত্রীদের পরিচয়
-
পেগি হুইটসন (যুক্তরাষ্ট্র): অভিজ্ঞ মহাকাশচারী ও মিশনের কমান্ডার
-
স্লাভোস উজানানস্কি (পোল্যান্ড): মিশন বিশেষজ্ঞ
-
টিবোর কাপু (হাঙ্গেরি): জিও-সায়েন্স গবেষক
এই আন্তর্জাতিক দল সফলভাবে কাজ করে মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে নতুন পাতার সূচনা করল।
আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা
শুভাংশুর মহাকাশ যাত্রা ও প্রত্যাবর্তনের পর NASA, ESA, ISRO এবং UNOOSA তাঁকে অভিনন্দন জানায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তাঁকে ‘Emerging Star of Asian Space Science’ বলে অভিহিত করে।
ভারতের মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত
ISRO-এর দাবি, শুভাংশুর এই সফল মিশনের ফলে ভারতীয় মহাকাশচারীদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অংশগ্রহণ অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে। ২০২৬ সালের গগনযান মিশনের জন্য শুভাংশুর অভিজ্ঞতা এক অমূল্য রিসোর্স হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: কি বলছে ইসরো ও DRDO
ISRO চেয়ারম্যান বলেন—
“শুভাংশুর অভিজ্ঞতা আমাদের ভবিষ্যতের মিশন পরিকল্পনায় বাস্তবভিত্তিক উপাত্ত দেবে। আমরা তাঁকে Gaganyaan-II-তে প্রধান পাইলট হিসেবে দেখতে চাই।”
DRDO-ও ভবিষ্যতে তাঁর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
রাষ্ট্রের শ্রদ্ধা ও গণসংবর্ধনার প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুভাংশুকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও তাঁকে গণসংবর্ধনার জন্য রাষ্ট্রপতি ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আগামী ২০ জুলাই দিল্লিতে আয়োজিত হবে একটি বিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।
উপসংহার: শুভাংশু, তুমি ভারতের নক্ষত্র
আজ শুভাংশু শুক্লা কেবল একজন মহাকাশচারী নন, তিনি কোটি কোটি ভারতীয়র হৃদয়ের নায়ক। তাঁর প্রত্যাবর্তন আমাদের বলে দেয়—
“আকাশ সীমা নয়, শুরু মাত্র।”
শুভাংশু, তোমার মতো সন্তানদের জন্যই গর্বে বুক ফুলে ওঠে ভারতের।


0 মন্তব্যসমূহ
welcome to India tonight news