📍indiatonight.in | দুর্গাপুর | ১৮ জুলাই ২০২৫ |
ভূমিকা — মোদীর বাংলা সফরের প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলা সফর ছিল কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং রাজ্যের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিবেশ ঘিরে গভীর উদ্বেগের প্রকাশ। দুর্গাপুর থেকে দেওয়া তাঁর ভাষণে উঠে এল একাধিক ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ, বর্তমান প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং ভবিষ্যতের আশ্বাস।
মুর্শিদাবাদের দাঙ্গা প্রসঙ্গ — কেন উঠল বিনিয়োগের মঞ্চে?
“মুর্শিদাবাদের মতো জেলায় যখন ছোটখাটো বিষয়েও দাঙ্গা হয়, হিংসা হয়, পুলিশ একতরফা পদক্ষেপ নেয়, তখন কেউ কীভাবে বিনিয়োগ করবে?”—এই কথায় চমকে গিয়েছেন অনেকেই। শিল্প নিয়ে বক্তব্যে হঠাৎ এমন স্পর্শকাতর জেলাকে টেনে আনার কারণ কী?
মোদীর যুক্তি স্পষ্ট: আইনশৃঙ্খলা বিনিয়োগের প্রধান শর্ত। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, এই দাঙ্গা-হিংসাই শিল্পপতিদের পিছু হটাচ্ছে।
দুর্গাপুর মঞ্চের ভাষণ — বার্তা শুধুই রাজনৈতিক নয়
মঙ্গলবার বিজেপির মঞ্চ থেকে মোদীর ভাষণ ছিল দীর্ঘ ও আবেগঘন। বাংলার অতীত গৌরব স্মরণ করে বর্তমান পরিস্থিতিকে করুণ বলেই চিত্রিত করলেন। দ্বারকানাথ ঠাকুর, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও বিধানচন্দ্র রায়ের নাম করে তুলে ধরলেন কীভাবে বাংলা এক সময় দেশের শিল্পের প্রেরণা ছিল।
ঐতিহাসিক গৌরব বনাম বর্তমানের হতাশা
একদিকে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও তাঁর শিল্পনীতি, অন্যদিকে বর্তমান যুবকের কর্মহীনতা—এই তুলনা মোদী যথেষ্ট কৌশলে করলেন। বললেন, “এই মাটিতেই শিল্প জন্ম নিয়েছিল, অথচ আজকের বাংলায় সেই ঐতিহ্যের কোনও চিহ্নই নেই।”
দুর্গাপুর, বর্ধমান, আসানসোল—কারখানার তালা এখন নতুন বাস্তবতা
মোদী আরও বলেন, “এককালে এই অঞ্চল ভারতের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন ছিল। এখন নতুন শিল্প আসছে না, বরং পুরোনোগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।” সরকারি নথিপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, এক দশকে এই অঞ্চলে প্রায় ৪৭টি মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিট বন্ধ হয়েছে।
বাংলার যুবসমাজ — বাইরে পাড়ি দেওয়া বাধ্যতা?
প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে হতাশা—“আজকের প্রজন্মকে ছোট চাকরির জন্যও বাংলার বাইরে যেতে হচ্ছে।” কর্মসংস্থানের হাহাকারকে মূল ইস্যু করেই বিজেপি বাংলার রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে চাইছে।
নতুন প্রকল্পের ঘোষণা — কতটা বাস্তবায়নযোগ্য?
দুর্গাপুর থেকে একাধিক নতুন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছে—ডেটা সেন্টার, লজিস্টিক হাব, আধুনিক শিল্পতালুক। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই সব প্রকল্প কতটা রূপ পাবে রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার আবহে?
প্রযুক্তি এবং Make in India: বাংলা কোথায় পিছিয়ে?
মোদীর মতে, “একবিংশ শতাব্দী প্রযুক্তির যুগ। বাংলার শিল্পেও সেই প্রযুক্তি ঢুকতে হবে।” মোদীর বক্তব্যে কেন্দ্রের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্প বাংলার জন্য বিশাল সুযোগ, তবে তা বাস্তবায়িত হবে কবে?
আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে বিনিয়োগকারীদের ভয়
বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পপতিরা রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ব্যবসায়ী মহলের একাংশ জানিয়েছেন, “জেলা স্তরে পুলিশি পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিনিয়োগে বাধা।”
তৃণমূলকে নিশানা — ‘উন্নয়নের সামনে দেওয়াল’
প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, “তৃণমূল সরকার উন্নয়নের সামনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন বদলালে, তবেই বিকাশ সম্ভব।” এই বার্তায় স্পষ্ট ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতির আভাস।
বন্দরের ভূমিকা এবং রপ্তানি সম্ভাবনা — কেন কাজে লাগানো যাচ্ছে না?
বাংলায় রয়েছে হলদিয়া, কলকাতা বন্দর—দেশের প্রাচীনতম বন্দরগুলির মধ্যে অন্যতম। মোদী বলছেন, “এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার ব্যবহারে ব্যর্থ।” শিল্পাঞ্চলে অবকাঠামো নেই বলেই বিদেশি লগ্নি আসছে না।
রাজ্য বনাম কেন্দ্র — উন্নয়ন কি রাজনৈতিক সংঘাতের বলি?
কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্য সরকারের বাধা বা উপেক্ষা—এ অভিযোগ বহু পুরনো। মোদীর বক্তব্যে ফের সেই ইঙ্গিত, “তৃণমূল সরকার না বদলালে কোনও প্রকল্প বাস্তব রূপ পাবে না।”
মানুষের চোখে মোদীর বার্তা — আশা না প্রতিশ্রুতি?
দুর্গাপুরের একাধিক বাসিন্দা বলছেন, “মোদীজি যেটা বলেছেন তা সত্যি, কাজ নেই, কারখানা বন্ধ। কিন্তু আগে যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার কতটা হয়েছে?” প্রশ্ন থাকছে, বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা?
বিরোধীদের পাল্টা দাবি — ‘সুপরিকল্পিত অপপ্রচার’
তৃণমূল কংগ্রেস এই ভাষণকে ‘ভোটের আগে কুৎসা’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, “মুর্শিদাবাদের দাঙ্গার প্রসঙ্গ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিনিয়োগ থেমে নেই, বরং কৃষি ও MSME খাতে বাংলা অগ্রণী।”
উপসংহার — রাজনীতি, শিল্প আর ভবিষ্যতের মঞ্চ
মোদীর ভাষণে যেমন রয়েছে বাংলার প্রতি গর্ব, তেমনই রয়েছে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ। শিল্প বিনিয়োগকে হাতিয়ার করে আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক দায় তুলে ধরলেন তিনি। এই বার্তা কতটা প্রভাব ফেলবে সাধারণ ভোটারের ওপর, তা সময় বলবে। তবে ২০২৬-এর নির্বাচন যে ‘উন্নয়ন বনাম বিশৃঙ্খলা’ ইস্যুতে এগোবে, তা আজকের দুর্গাপুর থেকেই স্পষ্ট।
.webp)

0 মন্তব্যসমূহ
welcome to India tonight news